লন্ডন টাইমসের জন্য মৌসুমী জাহানের লেখা


নিয়তির মুচকি হাসি ।। মৌসুমী জামান ।।


নিয়তির মুচকি হাসি ।।  মৌসুমী জামান ।।

মৌসুমী জামান

 

মিত্রিকা যখন জোনাকির আলো ম্লান করে রঙ বে-রঙের প্রজাপতির সাথে পাল্লা দিয়ে বাতাসের কানে কানে বলে যাচ্ছিলো ।

এক ঝাঁক সুখের পায়রা কিভাবে কিসের নেশায় নীড়ে ফিরে যায় । অনিচ্ছা সত্ত্বেও সূর্যদেব সারাদিনের কর্মদশা থেকে মুক্তি নিয়ে পৃথিবীকে অন্ধকারে নিমজ্জ্বিত করবে জেনেও পৃথিবী আবীর রঙে নিজেকে সাজিয়ে কপালে লালটিপ পরে সূর্যদেবকে কি করে বিদায় দেয় । কিভাবে দিন আর রাতের মিলনে গোধূলিবেলা হয় ।
সে কথা শুনে বাতাস যখন আলতো করে চুল ছুঁয়ে যায় । ও তখন বাতাসের নিবিড় আলিঙ্গনে ভালোলাগার আবেশে সিক্ত হয়ে কখন যে নিজের বাড়ির রাস্তা পেরিয়ে নদীর ধার দিয়ে অনেক দূর চলে এসেছে বুঝতে পারেনি । বুঝতে পারলো যখন দেখল কেউ একজন সামনে পথ আগলে আছে ।

ছেলেটি শুধু আজ নয়। অনেকদিন ধরেই মিত্রিকার পেছনে পড়ে আছে। কোথাও যেয়ে শান্তি পাইনা। যেখানে কল্পনাও করেনি সেখানেও যেয়ে হাজির। যেদিন ও বাড়ি থেকে বের হয় না সেদিন যে কতবার ওদের বাড়ির সামনে দিয়ে আসা যাওয়া করে তার ইয়ত্তা নেই।

সবসময় বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর কলেজ মাঠে মাস্তানি তো আছেই । কিন্তু যখন মিত্রিকার পিছু নেয় তখন সে একা। দেখে বোঝার উপায় নেই এর কথায় ১০ /১২ টা ছেলে ওঠে আর বসে। আদেও কি পড়াশোনা করে। না মাস্তানি করার জন্যই কলেজে আসে । যদিও কলেজ পড়ুয়া ছেলে মনে হয়না। অনেক পরে অবশ্য জেনেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

অনেক দিন ধরে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে , সে মিত্রিকাকে ভালোবাসে । মিত্রিকা কখনও পাত্তা দিইনি। সব সময় মারামারী চাদাবাজী নেশায় আচ্ছন্ন থাকা একটা ছেলের সাথে প্রেম করা, অসম্ভব। মিত্রিকার চোখে সে একটা বাজে ছেলে ছাড়া আর কিছু নয় ।

আজ এই নিরব নিস্তব্ধ পরিবেশে ছেলেটকে দেখে একটু ঘাবড়ে যায়। বাসার দিকে ফিরতে উদ্দৃত হলে ছেলেটি মানে বিজয় ওর পথ আগলে দাঁড়ায়। অনেক অণুনয় বিনয় করে ভালোবাসা নিবেদন করে কিন্তু মিত্রিকাকে কিছুতেই বোঝাতে পারলো না।

এই নিবেদন ওর কাছে অনেক সস্তা মনে হলো। সহজ সরল ভালোবাসা চিরদিনই সস্তা মনে হয়। যা সহজে পাওয়া যায় তা বুঝি সহজে হারিয়েও যায়। ওর পাওটাই যে এভাবে তৈরি হয়ে এসেছে। জন্মের পরেই মাকে হারিয়েছে। বাবার চাকরী সূত্রে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে নিজের আত্মীয় স্বজনদের কেউ পাশে পাইনি তেমন করে।

ওর জগত শুধু বাবাকে নিয়েই। চারপাশের পরিবেশ শিখিয়েছে কিভাবে প্রতিটি পথ মেপে চলতে হয়। আর সেই পথগুলোই ওকে কঠিন থেকে কঠিনতম করে দিয়েছে। মাঝে মাঝে পাথরের বুকে যে কড়ির দেখা মেলেনি তা নয়। তবে আলো আর বাতাসের অভাবে তা স্বভাবহীন হয়ে পড়েছে।

বিজয় সরাসরি মিত্রিকার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেয় । কিন্তু ওর বাবাও রাজী হলনা।। এমন ছেলেকে কে তার মেয়ের জামাই করবে । বড়লোক বাবার উছন্নে যাওয়া । তবে শুনেছে ছেলেটির বাবা এই এলাকার বেশ প্রভাবশালী ব্যক্তি। সকলেই তাকে মান্যগণ্য করে। কিন্তু ছেলেকে কেন মানুষ করতে পারিনি কে জানে। পত্রিকাটা ভাজ করে টেবিলের উপর রেখে ভাবতে থাকে –
সন্তানের গর্বে গর্বিত হতে সব মা বাবা চাই । কিন্তু ক’জনেরই বা সে আশা পূরণ হয়। আমার যদি একটা ছেলে থাকতো তাহলে কি পারতাম, মেয়েকে যেমন গড়েছি। আচ্ছা ও মিত্রিকার কোন ক্ষতি কররে না তো, করতেই পারে। একমাত্র মেয়ের বিপদের আশংকায় উতলা হয়ে উঠলো পিতৃহৃদয় ।

মিত্রিকা প্রথমে না করেছিল বাবার অনুরোধে কয়েকদিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে যেতে রাজী হল।
– কিন্তু বিজয়ের চোখ এড়াতে পারলো না সেখান থেকে মিত্রিকাকে হরণ করলো।
– বিজয় মিত্রিকাকে বলল ,কেন সে নিয়তির নষ্ট পরিহাস । তবে তোমাকে পেলে সব ছেড়ে ভালো হয়ে যাব। ভালোবাসা পেলে মানুষ কি না পারে । কিন্তু কিছুতেই মিত্রিকার মন হরণ করতে পারলো না ।

মিত্রিকা সুযোগ বুঝে পালিয়ে এলো ।

বিবেকহীন সমাজের ধিক্কারে দিশেহারা হয়ে পড়ে। মিত্রিকার এই চরম বিপদের দিনে ওর ভালবাসার মানুষের কাছে ছুটে যাই ।

ছেলেটি নিরব কঠিন ভাষায় সযতনে ওকে ফিরিয়ে দেয়।
বলা বাহুল্য, ইতিমধ্যেই মিত্রিকার বাবা তার বোনের ছেলের সাথে মিত্রিকার বিয়ে ঠিক করেছিল। বিয়ে যেহেতু অবশ্যম্ভাবী তাই জানাশোনা থেকে দুজনের মনের গভীরে একে অপরের জন্য জায়গা করে নিয়েছিল। হঠাৎ এই ঝড়ের আগমনী বার্তা। এ ঝড় শুধু তার সমস্ত বিশ্বাসকেই উড়িয়ে নিলোনা ।
দিলো এক ভাঙ্গাবুক , শ্মশানভূমি ।

মিত্রিকা যতবারই আত্মহত্যা নামক জঘন্য কাজটি করতে যায় । ততবার-ই বিজয়ের মুখটিই কেন ওর সামনে ভেসে আসে । সহজ সরলতার কাছে হেরে যায় মিত্রিকা । কাজটি কিছুতেই করতে পারেনা ।
এদিকে বিজয় মিত্রিকাকে হারিয়ে প্রায় উম্মাদ।খারাপ কাজ ছেড়ে দেয় । একে একে সবাই ওকে ছেড়ে চলে যায়। একা হয়ে পড়ে। কোথাও যায় না, কারো সাথে মেশেও না তেমন ।
এমন কি মিত্রিকার সামনেও আর আসেনি। নির্জনতার গহ্বরে নিমগ্ন হয়ে সাধিকার সাধনাপিটে নিজের সমাধি গড়বে বলে এতটাই বদ্ধ পরিকর যে –
মিত্রিকা যখন অস্তিত্ব বিহীন বীণাখানী হাতে নিয়ে কত যে আঁধার মাড়িয়ে নৈশ প্রহরে সুর তোলে, চেষ্টা করে
। তারপরেও ভাঙ্গনের সুরই শুধু বেজে যায়।
মিত্রিকা জানে এ সুর কি সুরের বাঁধনে আর বোধহয় জড়াবে না !!!!
মন মানার যন্ত্রটাও হারিয়ে যাবে অবশেষে ????

“ওদের এই দশায় নিয়তিও মুচকি হেসে চলে যাই প্রতিদিনের  কর্মদশায় ।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





related stories


error: Content is protected !!