ফিলিস্তিন থেকে আসা প্রেমিক


ফিলিস্তিন থেকে আসা প্রেমিক

মাহমুদ দারবিশ (১৯৪১-২০০৮)

তর্জমাঃ ইরফানুর রহমান রাফিন

তোমার চোখগুলো আমার হৃদয়ে কাঁটা হয়ে আছে;
আমাকে কষ্ট দেয়, আমি তবু ভালোবাসি তাকে
আর হাওয়ার হাত থেকে সামলে রাখি।
আমার মাংসে ডুবে যেতে দেই
রাত্রি আর দুঃখ থেকে লুকিয়ে রাখি,
আর তার জখমটা নক্ষত্রের আলো জ্বালায়।
আমার বর্তমান তার ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়
যা আমার কাছে আমার আত্মার চেয়ে প্রিয়।
যখন আমাদের চোখগুলো মিলেছিল, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ভুলে গেছিলাম
যে একদিন, বন্ধ দরজার ওপাশে,
আমরা ছিলাম দুজন।

তোমার শব্দগুলো ছিল একটা গানের মতন
যা আমি গাইবার চেষ্টা করতাম,
কিন্তু বসন্তের ঠোঁটগুলোকে ঘিরে রাখত অসহ্য যন্ত্রণা।
সোয়ালোপাখির মত, তোমার শব্দগুলোরও ডানা গজাত।
ভালোবাসাতাড়িত,
তারা চলে গেছিল আমাদের বাড়ির গেটটা ছেড়ে
চলে গেছিল এর শরৎকালীন দুয়ার থেকেও।
আমাদের ভাঙা আয়নাগুলো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল
আমার দুঃখ তার সহস্র খণ্ডে ছড়িয়ে পড়ল;
আমরা শব্দের ভাঙা টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিলাম।
আমরা শুধু আমাদের দেশের বিষাদসঙ্গীতই গাইতে পারতাম।
একটা গিটারের হৃদয়ে আমরা এটা পুঁতে দেব
আর বাজিয়ে চলব আমাদের ট্র্যাজেডির টেরেসে
বিকলাঙ্গ চাঁদ আর পাথরের তরে।
কিন্তু আমি ভুলে গেছিলাম…
বাজনায় যা জং ধরিয়েছিল তা তোমার প্রস্থান
নাকি আমার নৈঃশব্দ?

আমি তোমাকে দেখেছি গতকাল, পোতাশ্রয়ে;
তুমি ছিলে এক নিঃসঙ্গ মুছাফির, রসদ না-থাকা।
আমি এতিমের মত ছুটে গেছি তোমার দিকে
আমাদের পিতাদের প্রজ্ঞার ব্যাপারে প্রশ্ন করতে করতেঃ
“কেন সবুজ কমলার গাছগুলোকে –
টেনে নিয়ে যাওয়া হয় কারাগারে আর বন্দরে,
আর তাদের এই পথপরিক্রমা সত্ত্বেও
লবন আর আকুতির সুবাস সত্ত্বেও –
কেন তারা চিরকালই সবুজ রয়ে যায়?”
আর আমি আমার ডায়েরিতে লিখলামঃ
“আমি কমলা ভালোবাসি, কিন্তু ঘৃণা করি পোতাশ্রয়।”
আমি পোতাশ্রয়টিতে দাঁড়িয়ে থাকলাম
আর দুনিয়াটা দেখলাম তুষারের চোখ নিয়ে।
কমলার খোসাটাই কেবল আমাদের।
আমার পেছনে ছিল মরুভূমি।

আমি তোমাকে দেখেছি বনগোলাপে ঢেকে থাকা পাহাড়গুলোতে;
তুমি সেই মেষপালিকা যার কোনো মেষ নেই,
যাকে তাড়া করে ফেরা হয় ধবংসস্তূপে।
তুমি ছিলে আমার বাগান
যখন আমি ঘর থেকে দূরে ছিলাম।
আমি টোকা দিতাম দরজায়, হৃদয়ে আমার,
কারণ দরজা আর জানলাগুলো, সিমেন্ট আর পাথরগুলো
আমার হৃদয়ের ওপর বানানো।

আমি তোমাকে দেখেছি জলকূপগুলোতে
আর ভাঙাচোরা সব শস্যাগারে।
আমি তোমাকে দেখেছি নাইটক্লাবগুলোতে, টেবিলের ওপর অপেক্ষারত।
আমি তোমাকে দেখেছি জখম আর কান্নার আলোয়।
তুমি জীবনের একটা বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস;
তুমি আমার ঠোঁটগুলোর স্বর;
তুমি পানি… তুমি আগুন।

আমি তোমাকে দেখেছি গুহার মুখে,
তোমার অনাথ নেকড়াগুলো দড়ির ওপর শুকাচ্ছিলে।
আমি তোমাকে দেখেছি দোকানে দোকানে, রাস্তায় রাস্তায়,
আস্তাবলে আর সূর্যাস্তে।
আমি তোমাকে দেখেছি এতিম আর হতভাগাদের গানে।
আমি তোমাকে দেখেছি বালিতে আর লবনে।
তোমার রূপ ছিল মৃত্তিকা, শিশু আর জেসমিনের।

আমি কসম খাচ্ছি
আমার চোখের পাপড়ি থেকে একটা চাদর বুনবো
আর তা অলঙ্কৃত করব কবিতায়, তোমার চোখগুলোর জন্য
আর একটা নামে যা,
তোমার প্রেমে গলে যাওয়া একটা হৃদয়
দিয়ে ধুইয়ে দেয়া হলে,
গাছগুলোকে আবার সবুজ করে তুলবে।
আমি একটা বাক্য লিখব যা শহিদান আর চুমুর চেয়েও প্রিয়ঃ
“ফিলিস্তিনি ছিল আমার দয়িতা, এখনো তাই আছে!”

এক ঝড়ের রাতে আমি জানলা খুলেছিলাম
আর দেখতে পেয়েছিলাম একটা বিকলাঙ্গ চাঁদ।
আমি রাত্রিকে বললামঃ “চলে যাও
অন্ধকারের বেড়া পেরিয়ে চলে যাও!
বিজলি আর শব্দের সাথে আমার মিটিং আছে।”
তুমি আমার কুমারি উদ্যান
যে-পর্যন্ত আমাদের গান
খাপ খোলা তলোয়ার যেন।
বীজের মত বিশ্বস্ত তুমি
যে-পর্যন্ত আমাদের গান
পরিপুষ্ট করে রাখে ভূমি…
তুমি একটা রুহানি তালগাছ
কাটতে পারে না যাকে হাওয়া, কাঠুরিয়ার কুড়াল
তোমার রজ্জুগুলোকে রেহাই দিয়েছে
মরুর শ্বাপদ আর বন।

কিন্তু আমি নির্বাসিত একজন।
তোমার চোখগুলো দিয়ে আমাকে মুড়ে দাও
তুমি যেখানেই থাক আমাকে নিয়ে যাও –
তুমি যেই হও আমাকে নিয়ে যাও।
আমাকে মনে করিয়ে দাও চেহারার রং
আর দেহের উত্তাপ,
আঁখি আর হৃদয়ের আলো,
রুটি আর রিদমের নুন,
মৃত্তিকার স্বাদ… মাতৃভূমি।
তোমার চোখগুলো দিয়ে আমাকে হেফাজত কর।
আমাকে নিয়ে যাও দুঃখপ্রাসাদের একটা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে
আমাকে নিয়ে যাও একটা খেলনা হিসেবে, বাড়ির একটা ইট
যেন আমাদের ছেলেমেয়েরা ফিরে আসার কথা মনে রাখে।

তার চোখগুলো ফিলিস্তিনি;
তার নামটা ফিলিস্তিনি;
তার স্বপ্ন আর দুঃখগুলো;
তার চাদর, তার পা আর তার শরীর;
তার শব্দগুলো আর তার নৈঃশব্দও ফিলিস্তিনি;
তার জন্ম… তার মৃত্যু।
আমি তোমাকে বয়ে বেড়িয়েছি আমার পুরনো নোটখাতায়;
তুমি ছিলে আমার কবিতাগুলোর আগুন,
আমার সফরগুলোর খোরাকি।
তোমার নামে আমি উপত্যকাগুলোয় চিৎকার করেছিঃ
“আমি রোমকদের ঘোড়াগুলোকে জানি
যদিও যুদ্ধক্ষেত্র পাল্টে গেছে।
বজ্রপাতের ব্যাপারে সাবধান
আমার গানগুলো গ্রানাইটে উৎকীর্ণ।
আমি হচ্ছি তারুণ্যের আগুন আর নাইটদের নাইট।
আমি মূর্তিভঙ্গকারী।
আমার কবিতাগুলো ঈগল
পাক খায় লেভান্তীয় সীমানাগুলোর ওপর।”

তোমার নামে আমি শত্রুর দিকে চেঁচিয়ে বলেছিঃ
“কৃমির দল, খুবলে খাও আমার মাংস যদি ঘুমিয়ে পড়ি আমি।
পিঁপড়ার ডিম থেকে জন্ম হয় না ঈগলের,
আর একটা সাপের ডিমের খোলস
একটা সাপকেই লুকিয়ে রাখে।
আমি রোমকদের ঘোড়াগুলোকে জানি,
কিন্তু আমি এও জানি
যে আমি তারুণ্যের আগুন আর নাইটদের নাইট!”

অনুবাদকের নোটঃ দারবিশকে ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি গণ্য করা হয়। ফিলিস্তিনের কবিদের মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে তিনিই সবচেয়ে পরিচিত। এটি তাঁর জীবনের শুরুর দিককার একটি কবিতা। কবিতাটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন বাদরেদ্দিন এম. বেন্নানি। ছাপা হয়েছিল ১৯৭৪এ, জার্নাল অফ অ্যারাবিক লিটারেচারে। আমি ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছি। জায়নবাদী ইজরায়েল ফিলিস্তিনিদের ওপর যে-নারকীয় তাণ্ডব চালাচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের দরদী ও বাংলাদেশের একজন সামান্য অনুবাদক হিসেবে তাঁর প্রতিবাদে এই তর্জমাটি করা, আশা করি একদিন জর্দান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ভূখণ্ডটিতে প্রতিষ্ঠিত হবে স্বাধীন ফিলিস্তিন।

ARTWORK: ‘The Real Map: Palestine’ by Adige Batur

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





error: Content is protected !!