চীনের করোনা কূটনীতি-চীন কেন্দ্রে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে…


চীনের করোনা কূটনীতি-চীন কেন্দ্রে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে…

চীন যখন কেন্দ্রে অবস্থান করছে তখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা কোন দিকে যাবে। সাম্যবাদের দিকে ঝুঁকবে, নাকি গণতন্ত্রের দিকে। জোট-নিরপেক্ষতার নীতি বজায় রাখবে নাকি সব জোটেই নিজেকে যুক্ত করবে।
ভারত যখন করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করছে তখন চীন কৌশলগত সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার সাথে তার সম্পর্ক ঠিক করে নিচ্ছে। নেপালের কাঠমান্ডু পোস্টে লেখা এক কলামে বিনোজ বাসনিয়াত এমন মন্তব্য করেছেন।

চীনের মহামারী কূটনীতির বিষয়ে নেপালি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল বিনোজ লিখেছেনঃ করোনা মহামারী সম্পর্কে জল্পনা-কল্পনা আর অনির্দিষ্ট তথ্যের মধ্যেই চীন গত ১০ মাসে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে চার দফায় বহুপাক্ষিক ভার্চুয়াল সম্মেলন সেরে নিয়েছে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা এগুলোতে অংশ নিয়েছিল। স্টেইট কাউন্সিলর এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ২০২০ সালের জুলাইয়ে দেশটির মহামারী কূটনৈতিক উদ্যোগের অধীনে বিভিন্ন সহায়তা ও কৌশলগত কর্মসূচী নিয়ে সিরিজ সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন; যেগুলোর সর্বশেষটি ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত হয়। চীন যে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেকে ভালোভাবেই যুক্ত রাখতে চায়, এই ‘ডিপ্লোম্যাটিক অফেনসিভ’ থেকে সেটাই স্পষ্ট।

জুলাইয়ের বৈঠকে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিসি) এবং ট্রান্স-হিমালয়ান মাল্টি-ডাইমেনশনাল কানেকটিভিটি নেটওয়ার্কের সাথে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলকে যুক্ত করার বিষয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয়। তৃতীয় সম্মেলনে ভারত মহাসাগরের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পের পাশাপাশি চিকিৎসা সহায়তার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছিল।

ওয়াং বলেছিলেন, “আমরা সিপিইসি এবং ট্রান্স-হিমালয়ান কানেকটিভিটি নেটওয়ার্ককে সক্রিয়ভাবে প্রচার করবো, আফগানিস্তানে করিডোরের সম্প্রসারণকে সমর্থন করবো এবং পরবর্তীতে আঞ্চলিক সংযোগের লভ্যাংশ আরও বাড়িয়ে দেবো। আমাদের ভৌগলিক সুবিধা নিয়ে পুরোদমে কাজ করা উচিত, চারটি দেশ এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মতবিনিময় ও যোগাযোগ জোরদার করা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা উচিত।”

চীন মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ন্যাটোর মতো আরেকটি সামরিক জোটের সূচনা করছে এমন ধারণা ব্যক্ত করে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক বিনোজ লিখেছেনঃ

চীন নেতৃত্বাধীন চার দফার আলোচনায় সকলের ঐক্য সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে- করোনা মহামারী যৌথভাবে প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ; বহুপাক্ষিকতা বজায় রাখতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দৃড় সমর্থন নিয়ে করোনাভাইরাসের রাজনীতিকরণ এড়ানো; যৌথভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্প্রদায় গঠন; অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা পুনরায় শুরু করার সাথে মহামারীর প্রভাব; শিল্প ও সরবরাহ চেইনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিআরআই অবকাঠামো প্রকল্পের ধারাবাহিকতা; ডিজিটাল ক্ষেত্রে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি। এতে চীন-দক্ষিণ এশিয়া জরুরী ‘সাপ্লাই মেকানিজম’ এবং চীন-দক্ষিণ এশিয়া দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়ন অংশীদারি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি সম্মতি পায় এবং অপ্রচলিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নে অগ্রগতির বিষয়ে প্রাথমিক ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ওয়েই ফিংগে এই অঞ্চলে বাইরের শক্তির (দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক জোট স্থাপনে) বিরোধিতা করার জন্য শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশকে আহ্বান জানিয়েছেন। জেনারেল ওয়েই কোয়াড গ্রুপিংকে দূরে ঠেলে দেওয়ার জন্য এই মন্তব্য করেছেন, চীন যাকে একটি ছদ্মবেশী -সামরিক জোট বা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ন্যাটোর মতো আরেকটি সামরিক জোটের সূচনা হিসেবে দেখেছে।

ওয়াং ই সেপ্টেম্বরে রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং মঙ্গোলিয়া; অক্টোবরে কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, লাওস এবং থাইল্যান্ড; নভেম্বরে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া; ডিসেম্বরে নেপাল এবং পাকিস্তান সফর করেন। এই সফরগুলো চীনের প্রতিবেশী কূটনীতির অংশ হিসেবে পারস্পরিক সম্পর্ক বাড়ানো, সহযোগিতা আরও গভীরতর করা এবং সামরিক বিশ্বাসকে উন্নীত করতে করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এসব কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বিশেষত দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট ও বহুমুখী আন্তর্জাতিক পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ থেকে চীনের মূল স্বার্থরক্ষার জন্য করা যখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সামরিক সহায়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সংযোগ, সাধারণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্যমত, আঞ্চলিক কাঠামো, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, কৌশলগত সংযোগ এবং ‘প্রতিবেশীদের সাথে ভালো আচরণ’ চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে ‘মহামারী কূটনীতি কি মহামারী রাজনীতিতে গিয়ে ঠেকবে?’ এই হাইপোথিসিসে নিয়ে যাবে।

ইন্দো-প্যাসিফিকের হিমালয় অঞ্চলে উদীয়মান কোয়াড জোট এবং চীনের মহামারী কূটনীতির বিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাবের ক্ষেত্রে এক ধরনের সংযোগ বিচ্ছিন্নতা। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে বেজিংয়ের প্রচার-প্রচারণা করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা নিয়ে এসেছে। ভারত যখন করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করছে তখন চীন কৌশলগত সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার সাথে তার সম্পর্ক ঠিক করে নিচ্ছে।

বিনোজ মনে করেন- চীন এখন কেন্দ্রে। এই পরিস্থিতিতে নেপাল এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা জোট-নিরপেক্ষতা বা সব জোটে থাকার প্রশ্নে  আবার কোন দিকে যাবেঃ সাম্যবাদ বনাম গণতন্ত্রের লড়াইয়ে।

অনুবাদ-তারিক চয়ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





related stories


error: Content is protected !!