Opinion, Column: in Bangla


প্রয়োজন সহযোগিতা ও সহমর্মিতা


প্রয়োজন সহযোগিতা ও সহমর্মিতা

হুমায়রা নাজিব নদী

 

বিগত কয়েকদিন আশ্চর্য হয়ে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। বাংলাদেশিদের আর যে যে ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি আর করাকরি থাকুক না কেনো, আইনকানুন মেনে চলার ব্যাপারটায় তাদের মতো শিথিল আর ঢিলাঢালা জাতি পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। ঘটনাটা ছিলো এমন একজন নারী ডাক্তারকে পুলিশে প্রশাষনের কয়েকজন কর্মী লকডাউনের ভেতর পথে আটকে আইডি কার্ড দেখতে চান। এতে উক্ত নারী ডাক্তার রাগান্বিত হয়ে অনাকাংক্ষিত আচরন করেন।এক পর্যায়ে ওই নারী উদ্ধতভাবে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলে দাবী করেন। অনেককেই দেখলাম বিগত কয়েকদিনের হট টপিক ডাক্তার ভার্সেস পুলিশ ইস্যুতে মতামত দিচ্ছেন ‘আগে জীবন বাঁচলে পরে আইনকানুন’…এইযে একটা মেন্টালিটি ‘পরে আইনকানুন ‘ এই ভাবনাই আমাদের আজকের ক্রাইসিসের জন্যে দায়ী।ইনফ্যাক্ট লকডাউন মেনে চলাটাও ছিলো আইনকানুনভুক্ত একটা কাজ, যেটাকে আমরা দিনের পর দিন অবহেলা করে আজকের এই ভয়াবহতা তৈরী করেছি। আমাদের কাছে আইন মানার ব্যাপারটা চিরকাল লেস প্রায়োরিটি সম্পন্ন ননসিরিয়াস কাজের লিস্টেই রয়ে গেলো। এই করোনা মহামারীকালে একজন চিকিৎসকের ভুমিকা ডেফিনিটলি অনস্বীকার্য।তিনি জীবন বাজি রেখে আমাদের সেবা করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন। কিন্তু দিন শেষে তিনিও আপনার আমার মতোই রক্তমাংসের একজন মানুষ।আইডি কার্ড তিনি ভুল করে বাসায় রেখে আসতেই পারেন। তাঁর এই ভুলটা খুবই স্বাভাবিক। যেটা মোটেও স্বাভাবিক এবং এ্যাক্সেপ্টেবল ছিলো না, সেটা হচ্ছে তাঁর ম্যানার। আপনার ম্যানারই আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু প্রকাশ করে দেয়।যারা এই খারাপ ম্যানারের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলে গেলেন ‘বেঁচে থাকলে পরে আইন’.. তাদেরকে বলবো, কথাটা তো এইভাবেও হতে পারতো যে ‘যতদিন বাঁচবো, দেশের আইনকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ফেয়ার ওয়েতে বাঁচবো।’ আইনকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলে প্রতি বছর ফুটব্রিজ ব্যাবহার না করে রাস্তা পার হতে গিয়ে এত দুর্ঘটনা ঘটতনা।

আইনকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সামাজিক দূরুত্ব মেনে চললে আজকের এই লকডাউনেরও প্রয়োজন পরতোনা। আর চিকিৎসকদেরও এত দৌড়ের উপরে থাকতে হতোনা। আজকের করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতার জন্যে আমাদের উদাসীনতা আর আইনকানুনের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল অসহযোগী মনোভাবই দায়ী।

জন্ম মৃত্যু সবকিছু সৃস্টিকর্তার হাতে। কিন্তু আমরা সঠিক পথে থেকে ভোগান্তি অনেকটাই এড়াতে পারি। লাভের পাল্লা সেখানে আমাদেরই ভারী।এখন যদি সংকল্প করে বসে থাকি নিজের নাক কেটে হলেও অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করবো, সরকার যে আইন প্রণয়ন করবে তার বিপরীত স্রোতে গা ভাসাবো, অথবা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলে আমি সব আইনকানুনের উর্ধ্বে, তবে আমাদের এই ভোগান্তির অবসান কোনোদিনও হবেনা। জি, এক্ষেত্রে অনেকে দাবি জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের যাতায়াতের জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা করা হোক। দাবিটা আমার কাছে যথেস্ট লজিকাল মনে হয়েছে। সেরকম ব্যাবস্থা থাকলে অবশ্য এই নির্দিস্ট ঘটনার ভোগান্তিটা এড়ানো যেতো। এক্ষেত্রে সরকারের প্রয়োজন চিকিৎসকদের প্রতি আরো বেশি সহমর্মিতা প্রদর্শন।

আর এ ধরনের ব্যাবস্থা যেহেতু সরকারী উদ্যোগে হয়নি, সুতারাং প্রশাষনে কর্তব্যরত কর্মীরা আইডি কার্ড দেখতে চাইতেই পারেন। যে দেশে প্রতি পদে পদে ধোঁকাবাজি আর ফটকামি , সেই দেশে কেবল মাত্র সাদা এ্যাপ্রনের উপর ভরসা না করে আইডিকার্ড দেখতে চেয়ে প্রশাষনকর্মীরা দায়ীত্বশীলতার পরিচয়ই দিয়েছেন।আর যিনি নারী ডাক্তর তিনি ভুল করে আইডিকার্ড সঙ্গে আনেননি, কথাটা ভদ্র স্বাভাবিক ভাষায় বুঝিয়েও বলা যেতো। বিপত্তিটা ঘটেছে একটা ছোট্ট ‘সরি’ বলার বদলে যখন দাম্ভিকতার সাথে খারাপ ব্যাবহার করেছেন তখন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আর টপ লেভেলের ডাক্তার হলেই তিনি আইনের উর্ধ্বে থাকবেন , এমন গ্যারান্টি কি উনি আসলেই সরকার থেকে পেয়েছেন ?

আসলে দুপক্ষ বিচার করলে বোঝা যায় আমাদের সহযোগিতা আর সহমর্মিতার বড্ড অভাব।ভালো কোনো কাজে সাপোর্ট না দিয়ে আমরা সাপোর্ট দেই মানুষের এ্যাগ্রেসিভ আচরনকে। আমরা সাফাই গাই মানুষের আইন না মানার প্রবণতার।আসলে আমাদের নিজেদের ভেতরেও একই প্রবণতা কাজ করে আসছে বহুকাল ধরে।তাই নিজের কাজের জাস্টিফিকেশান হিসেবে এই আনফেয়ার সামর্থ্যন।এইক্ষেত্রে যদি প্রশাষনকর্মীরা খারাপ ব্যাবহার করে থাকে, সেটাও সমভাবে নিন্দনীয়। আইন না মানার প্রবনতা আর সেটা ঢাকতে এ্যাগ্রেসিভ আচরন কখনোই সামর্থনযোগ্য নয়। ‘আগে বাঁচুন, পরে আইন মানুন’ এই ধরনের বোকার পৃথিবী থেকে বেড়িয়ে আসুন। আইন মানলেই নিজেকে বাঁচাতে পারবেন, না মানলে সারাজীবন বাঁচামরা নিয়ে এরকম ভোগান্তি আর দৌড়ের উপরই জীবন যাবে।

মনে রাখবেন আজকের বাংলাদেশের এই পরিস্থিতি আমাদের আইন না মানারই ফসল। আইন কানুন তোয়াক্কা না করে পার্টি করা, গেদারিং, সমাবেশ, এইগুলির পরিনতি হচ্ছে আজকের বাংলাদেশের লাগামহীন করোনা পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হচ্ছে আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা, দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের বাংলাদেশিদের মধ্যে এর যথেস্ট ঘাটতি রয়েছে।

 

(লেখক- সহযোগী সম্পাদক, বেগম টুয়েন্টিফোর ডট কম। সংবাদ উপস্থাপিকা চ্যানেল এইট ও লন্ডন রেডিও) ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





error: Content is protected !!